Blog

ব্যক্তিগত বৈশাখ

[বহুদিন আগে…] বাবার সাথে এক মেলায় গিয়েছিলাম, স্কুল অব্দিও যাইনি তখনো।
বাবার সেই হাড়গিলা বাইকটার সামনে বসে, লোহার রডটা ছাড়তামনা কখনো।
সেই মেলার স্টলগুলো ছিল ছাপরার, মাটিতে কাপড় বিছিয়ে সাজানো টংটং গাড়ি।
তালপাতার সেপাই, কাঠের ট্রাক, মাটির পুতুল কিংবা এক টাকার লটারি।
নাগরদোলায় চেপে সে সময় দুলতো স্বপ্ন, সার্কাসের বাঘ পোষ মানত ছোট্ট হৃদয়ে।
মাকে এসে বলতাম “জানো মা, সিংহের কেশরে বুলিয়েছি হাত” মা কেঁপে উঠত ভয়ে!
মাকে ভয় পাইয়ে দিয়ে আমার সেকি নান্দনিক সুখ, মায়ের দিকটা বুঝিনি তখনো।

বৈশাখ মানে আমার ভুলে যাওয়া সেই মেলা, আমার ধুলোজমা ছেলেবেলা।
বৈশাখ মানে আমার মায়ের আমাকে সাজিয়ে দেওয়া, গ্রামের ঘাটে অপেক্ষায় খেয়া।
বৈশাখ মানে মেলায় মুখর রাজবাড়িটার প্রাঙ্গন, পাটপচার গন্ধ, প্রতিমা বিসর্জন।
বৈশাখ মানে গ্রামের মানুষগুলোর দু’পয়সা আয়, স্বপ্ন বোনা তালপাখা আর নকশী কাঁথায়।
বৈশাখ মানে ঝড়ো বাতাস, কালবোশেখি, আর বোনের হাত ধরে আম কুড়োতে যাওয়া।
বৈশাখ মানে জানালাগুলো ঠিকঠাক আটকানো, ছাদে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা, অনেক না পাওয়া।

[বহুদিন পরে…] আবারো কোনো বৈশাখে, চারুকলার রাস্তায় কপোত কপোতীর ভিড়।
কাঁচা মরিচ আর পান্তা ইলিশ, অজস্র চেনা মুখ, অক্সিজেনের অভাবে অবস্থা অস্থির।
বাংলা সন কোনোদিন লিখিনি খাতায়, যেন আবহমান বাংলার সাথে শত অভিমান।
চারুকলাও আজ অনেকখানি দূরে, বৈশাখ বলতে আছে নির্জলা ওষ্ঠাগত প্রাণ।
রোলার-কোস্টারে চেপে এখনও দুলছে স্বপ্ন, যদিও এখানে বৈশাখে স্নো পড়ে ছাদে।
মাকে ফোনে বলি, “শোন মা, তোমাদের ছাড়া বেশ আছি” হয়তো মা কাঁদে!
মাকে কাঁদিয়ে আমার সেকি নান্দনিক সুখ, মায়ের দিকটা হয়তো আজও বুঝিনি।

বৈশাখ মানে সাদার জমিনে লাল পেড়ে শাড়ি, কপালে লাল টিপ, হাতে লালনীল চুড়ি।
বৈশাখ মানে বুয়েটের শহীদ মিনারে বৃথা বসে থাকা, নববর্ষে জেগে ওঠা ঢাকা।
বৈশাখ মানে ফেলে আসা দিন, অ্যাল্বাকার্কি চষে খুঁজে পাওয়া একটা পচা ইলিশ।
বৈশাখ মানে বৃথা হাহুতাশ, টিংলে বীচে ব্যস্ত বাতাসে কবিতা উড়িয়ে দিস।
বৈশাখ মানে ঝড়ো বাতাস, কালবোশেখি, আর মনের কানাচে দুঃখ কুড়োতে যাওয়া।
বৈশাখ মানে হৃদয় শুকিয়ে কাঠ; প্রকাণ্ড টর্নেডোর পর আবারো নিজেকে ফিরে পাওয়া।